এবার ফেরাও তাদের

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বহু পাঠকপ্রিয় কবিতার লাইনের মধ্যে অন্যতম একটি লাইন হচ্ছে, ভালোবাসার পাশেই একটা অসুখ শুয়ে আছে। ভালোবাসার বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে ইদানিং এই লাইনটি বেশি মনে পড়ে। কারণ প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের শিশুদের অংশগ্রহণ প্রায় শতভাগ। কিন্তু মাধ্যমিকে গিয়েই ঝরে পড়ছে প্রায় চল্লিশ শতাংশের ওপর। এটা নিঃসন্দেহে একটি অসুখ। এই অসুখ সারানোর কথা কী কেউ ভাববে না?

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এ নিয়ে ভাবার মতো কেউ নেই। যদি থাকত তাহলে আমাদের চোখের সামনে এমন পরিসংখ্যান দেখতে হতো না। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) প্রকাশিত ২০১৭ সালের শিক্ষা তথ্য প্রতিবেদন আমাদের দেখাচ্ছে, প্রাথমিক শেষে মাধ্যমিকে আসা শিক্ষার্থীদের ৪০ দশমিক ২৯ শতাংশই দশম শ্রেণী শেষ করতে পারে না। এরমধ্যে মেয়েদের ঝরে পড়ার হার আবার সবচেয়ে বেশি। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হওয়া ছাত্রীদের মধ্যে মাত্র ৫৪ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ মাধ্যমিক শেষ করতে পারে। অন্যরা ঝরে পড়ে।

কারণ কী? একটু তলিয়ে দেখব না?

ব্যক্তিগত কৌতুহল থেকেই এ প্রসঙ্গে কথা বলি বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সঙ্গে। বগুড়া জেলার আদমদীঘি থানার নশরৎপুর বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক জানান, অভিভাবকদের নিম্ন আয়, বাল্যবিয়ে ও দারিদ্র্যই এর অন্যতম কারণ।

‘কিন্তু সরকার তো উপবৃত্তির ব্যবস্থা রেখেছে?’ প্রশ্ন করি। উত্তরে তিনি বলেন, প্রচলিত শিক্ষাব্যয়ের তুলনায় উপবৃত্তি খুবই অপ্রতুল। এই টাকা দিয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাব্যয় মেটানো সম্ভব হয় না।

প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই স্কুল শিক্ষকের কথার সঙ্গে মিল খুঁজে পাই সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরীর বক্তব্যের। তিনি বলেন, বর্তমানে শুধু উপবৃত্তির টাকা দিয়ে পড়াশোনার ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হয় না। কারণ কোচিং-প্রাইভেটসহ অন্যান্য খরচ রয়েছে। এছাড়া সামাজিক ও আর্থিক বাস্তবতার কারণেও অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। (সূত্র: বণিকবার্তা, ২৫ মার্চ ২০১৭)।

এইসব আর্থ-সামাজিক কারণগুলোর পাশাপাশি আরও কিছু বিষয়ের প্রতি নজর দেওয়া জরুরি। যেমন: ছাত্র-শিক্ষকের অনুপাত। ব্যানবেইসের ওই প্রতিবেদনই জানাচ্ছে, মাধ্যমিক শিক্ষায় ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। সংস্থাটির হিসাবমতে, বাংলাদেশে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষায় প্রতি শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩৫, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। এক্ষেত্রে এ অঞ্চলে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ভুটান। দেশটিতে প্রতি ১৪ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন। এর বাইরে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ৩১:১, নেপালে ২৯:১, পাকিস্তানে ১৯:১ ও শ্রীলংকায় ১৭:১।

এরসঙ্গে সম্ভবত যুক্ত করা প্রয়োজন শিক্ষক প্রশিক্ষণের বিষয়টিও। উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাবে আমাদের শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষকে আনন্দদায়ক করতে পারেন না। ফলে শিক্ষার্থীরা যতক্ষণ শ্রেণিকক্ষে থাকে, ততক্ষণ তারা একধরনের নির্যাতন ভোগ করে। এছাড়া পাঠ্যপুস্তকের সীমাবদ্ধতা তো রয়েছেই। আমাদের পাঠ্যপুস্তকগুলো এমন ভাষায় লেখা, যা কোমলমতি শিক্ষার্থীরা মোটেও আনন্দসহযোগে পাঠ করতে পারে না। এই সবগুলো কারণ একত্রিত হয়ে আমাদের শিক্ষার্থীদের ঝওে পড়ার হার ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে।

বাংলাদেশ নানা ক্ষেত্রে দ্রুত উন্নতি করছে, সন্দেহ নেই। মানবসূচক উন্নয়নে অগ্রগতি হয়েছে, মাথাপিছু আয় রেড়েছে, মৃত্যুহার কমেছে ইত্যাদি। কিন্তু এসব উন্নতি টেকসই হবে না, যদি না শিক্ষাখাতের উন্নয়ন মজবুত হয়। তাই দেশকে সবার আগে শিক্ষায় সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। আর এ ব্যাপারে সরকারকেই সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। তারপরই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি দায় বর্তায় শিক্ষকদের ওপর। শিক্ষকরা যদি আরও সচেতন হোন, মানবিক হোন এবং আনন্দদায়ক উপায়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন তাহলে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া অনেকাংশে রোধ হবে বলে আশা করা যায়।

সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একটি স্কুলের কয়েকজন শিক্ষক রীতিমতো নজির স্থাপন করেছেন। পূজার ছুটিতে সবাই যখন আনন্দফূর্তিতে ব্যস্ত তখন কোচবিহারের তুফানগঞ্জে অন্দরান ফুলবাড়ি হরিরধাম স্কুলের শিক্ষকরা ড্রপআউট শিক্ষার্থীদের স্কুলে ফেরাতে তাদের বাড়ি বাড়ি ঘুরেছেন। অভিভাবকদের বুঝিয়েছেন, শুনেছেন তাদের সমস্যা। অনেক শিক্ষার্থী আবার ফিরে এসেছে স্কুলে।

আমাদের শিক্ষকরা কি এ ঘটনা থেকে কোনো শিক্ষা নেবেন না? ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের ফেরাতে কোনো উদ্যোগ নেবেন না?

রবীন্দ্রনাথ তাঁর এক কবিতায় বলেছেন, ‘এবার ফেরাও মোরে, লয়ে যাও সংসারের তীরে।’ তাঁর আহ্বানের সঙ্গে মিল রেখে বলি, এবার ফেরাও তাদের।

আমাদের নতুন সময়ে প্রকাশিত; ডিসেম্বর ২, ২০১৮

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s